কৃষি গবেষণায় দাতা সংস্থাগুলোর ওপর নির্ভরশীল না হতে বিজ্ঞানীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী। বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অব এক্সিলেন্সে ‘প্রতিকূল পরিবেশে সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবনে জিন প্রযুক্তির ব্যবহার’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এ আহ্বান জানান। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে লবণাক্ততা ও খরা সহনশীল প্রজাতির ধান উদ্ভাবনে দেশী বিজ্ঞানীরা সচেষ্ট রয়েছেন। কৃষিমন্ত্রী বলেন, “বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য দাতা সংস্থাগুলো কৃষি খাতে ঋণ দানে দীর্ঘসূত্রতার জন্ম দেয়। পরামর্শক নিয়োগ ও সুদের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ ফিরিয়ে নিয়ে যায়।” স্থানীয় বিজ্ঞানীদের নিজস্ব একাগ্রতা ও সরকারের সামর্থ্যরে পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার করলে আরও বেশি সফলতা অর্জন সম্ভব বলে মত দেন তিনি। প্রাণ রসায়ন ও অনুজীব বিজ্ঞান বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত এ আলোচনা সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, জীব বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোঃ আবুল বাশার প্রমুখ। সংগ্রহ – ঢাকা, নভেম্বর ০৪ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)
prodip 7:44 অপরাহ্ন on নভেম্বর 4, 2009 Permalink |
সেলিমের সুগন্ধি ধান, দৈনিক প্রথম আলো, ১৪ নভেম্বর ২০০৯
শখের শেষ নেই মানুষের। শখ মেটাতে গিয়ে কষ্টেও ক্লান্তি নেই। বরং এতে আনন্দই বেশি। এ জন্য একজন সংগ্রাহকের নিভৃত ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয় প্রিয় জিনিসে। এমন একজন সংগ্রাহক সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার কদমতলী এলাকার কৃষিপণ্য ব্যবসায়ী আবদুল বাছির ওরফে সেলিম (৩৬)। ৪১ জাতের সুগন্ধি ধান আছে তাঁর সংগ্রহে। শুধু সৌরভেই নয়, আকৃতি এবং চাষের পদ্ধতিতেও বেশ বৈচিত্র্য আছে এসব ধানে। সংগৃহীত ধানে বেশ কয়েকটি বিরল জাত রয়েছে। তবে স্রেফ মনের ক্ষুধা মেটাতেই আর দশজন শখের সংগ্রাহকের মতো এই ব্যতিক্রমী কাজে নামেননি তিনি। দেড় যুগ ধরে সংগৃহীত এসব সুগন্ধি ধান দেশের মানুষের বৃহত্তর কল্যাণে দান করবেন সেলিম। ১ অগ্রহায়ণ ‘কৃষি দিবসে’ কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের কাছে তিনি হস্তান্তর করবেন এসব ধানবীজ। পরে তা সরকারিভাবে সংরক্ষিত হবে।
অনুপ্রেরণার উত্স: এলাকায় তিনি ‘এবি কৃষি প্রকল্পের সেলিম’ নামে পরিচিত। ‘এবি’ আবদুল বাছিরের সংক্ষিপ্ত রূপ। এই প্রকল্প মূলত তাঁর ব্যবসা। ধানের বীজসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য বিক্রি করেন তিনি। ১৯৯০ সালে ১৭ বছর বয়সে ব্যবসায় নামেন সেলিম। সাধারণ ধান ও সুগন্ধি ধানের দামের মধ্যে বিশাল তফাত দেখতে পান তিনি। সুগন্ধি ধানের বীজ আকৃষ্ট করে তাঁকে। এসব বীজ বিক্রি শুরু করেন তিনি। তাঁর কাছে ধানের বীজ কিনতে আসা চাষিদের তিনি উত্সাহ দেন সুগন্ধি ধান আবাদে।
১৯৯৬ সালে সেলিমের উত্সাহে সুগন্ধি ধানের আবাদ শুরু হয় তাঁর নিজ এলাকা দক্ষিণ সুরমায়। শুরুতে একজন কৃষক এক বিঘা জমিতে কাটারিভোগের আবাদ করে ১৬ মণ ধান পেয়েছিলেন। এই ধান উত্পাদনে ব্যয় হয়েছে আড়াই হাজার টাকা। ধান বিক্রি করে পাওয়া যায় ২২ হাজার টাকা। এই সাফল্যের কথা ছড়িয়ে পড়লে অন্য কৃষকেরাও সুগন্ধি ধান আবাদে উত্সাহী হন। দক্ষিণ সুরমার পার্শ্ববর্তী উপজেলা বালাগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ, জকিগঞ্জে উচ্চফলনশীল ধানের পাশাপাশি কৃষকেরা অল্প জমিতে কাটারিভোগ ও চিনিগুঁড়ার উত্পাদন শুরু করেন। এখন হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরেও সুগন্ধি ধানের আবাদ হচ্ছে।
কৃষকদের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে সুগন্ধি ধান সংগহে অনুপ্রাণিত হন সেলিম। সিলেটসহ সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জের হাওর এলাকা থেকে একে একে বিভিন্ন জাতের সুগন্ধি ধানের বীজ জোগাড় করেন তিনি। এসব ধানের আঞ্চলিক নাম হচ্ছে তুলসীমালা, মৌবিরুই, রাতাবোরো, কন্যাশাইল, লাখাইবিরুই, দুমাই-আউশ, মুরালি-আউশ, বাগদার আমন, কালিজিরা, পাজাম-আমন, ভরিশাইল, তলাবিরুই, কালাপুরা, বাদাল, পাইজং, বাইগনবিচি, পুঁটিবিরুই, কাঁকরভূক, বাসমতি, কালামেকুরি, হাসিম, মালা, জড়িয়া, গেণ্ডিবিরুই, চিনিগুঁড়া, আখমিশাইল, বাশিরাজ, বোরোশাইল, বাদাল-আমন, ময়না, পরীচক, রতি, দামান্দমুখ, খইয়া-বোরো, লাঠি-আমন, গর্সিশাইল, কাটারিভোগ, কেটি, আইন-শাইল, চেংড়ি ও বাইগনবিচি বোরো।
সেলিমের সঙ্গে একদিন: সম্প্রতি এক সকালে কদমতলী গিয়ে সেলিমের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়। আধাপাকা এক ঘরে তাঁর নানা রকম কৃষিপণ্যের পসরা। এর মধ্যেই রয়েছে তাঁর শখের আয়োজন। স্বচ্ছ বয়ামে সুন্দর করে তিনি সাজিয়ে রেখেছেন ৪১টি সুগন্ধি ধানের নমুনা। তিনি জানান, হাওরসমৃদ্ধ সিলেট অঞ্চলে এক সময় কেবল সুগন্ধি ধানের চাষ ছিল। এ চাষের মূলে ছিল প্রকৃতির কৃপা। অনেক সুগন্ধি ধানের আবাদে সেচ ও সারের প্রয়োজনই পড়ে না। এমন ধানের মধ্যে আউশ মৌসুমে দুমাই, আমন মৌসুমে কালিজিরা, কালামেকুরি, বোরো মৌসুমের বাদাল উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে কালামেকুরি এক সময় সিলেটের সীমান্ত এলাকায় বেশি চাষ হতো।
সুগন্ধি ধান নিয়ে অনেক কিংবদন্তি কাহিনীও প্রচলিত রয়েছে। মেয়ের জামাইকে সিলেট অঞ্চলে ‘দামান্দ’ বলা হয়। শ্বশুরবাড়ি দামান্দের মুখ দেখা মাত্র যে ধানের চাল রান্না করতে হবে, তা হচ্ছে ‘দামান্দমুখ’। গ্রামের গৃহস্থ পরিবারে নবজাতক কন্যার মুখ দেখতে গিয়ে ‘কন্যাশাইল’ দিয়ে নিমন্ত্রণ খাওয়ানোর প্রথা অনেক আগে থেকেই প্রচলিত। শুধু রোপণ করলেই ক্ষেত ভরে ওঠে বলে ওই ধানের নাম হয়েছে ‘ভরিশাইল’।
সেলিম জানান, তাঁর অনুপ্রেরণায় আশপাশের বিভিন্ন এলাকার ২২ জন কৃষক এখন বিভিন্ন ধানের পাশাপাশি সুগন্ধি ধানের চাষ করছেন। এ থেকে তাঁরা প্রত্যেকেই লাভবান হয়েছেন। ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে সুগন্ধি ধানের আবাদ বিস্তৃত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। সেলিম বলেন, ‘যদি আমাদের ফসলি এলাকাগুলোতে বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়, যদি কৃষকের গোলা থেকে হারিয়ে যায় সব বীজধান, তখন আমার সংগৃহীত এসব ধানবীজ নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘আমি চাই, আমার সংগ্রহ করা ৪১ জাতের ধান অবিকৃত নামে সংরক্ষিত থাকুক।’
কৃষিব্যক্তিত্বদের কথা: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেটের উপপরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন জানান, পৃথিবীতে এখন ৪০ হাজার প্রজাতির ধানবীজ সংরক্ষিত রয়েছে। বাংলাদেশে রয়েছে ১২ হাজার প্রজাতির ধানবীজ। এর মধ্যে সংরক্ষিত সুগন্ধি ধান নিয়ে গবেষণা চলছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে। তিনি বলেন, ‘ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে সংরক্ষিত ধানের সঙ্গে সেলিমের সংগ্রহ করা ধানে আঞ্চলিকতার কারণে নামে ভিন্নতা থাকতে পারে। দেখা গেছে, একই প্রজাতির ধানের দক্ষিণাঞ্চলে এক নাম, হাওরাঞ্চলে আরেক নাম। এ জন্য হারানো বা বিলুপ্ত কোনো প্রজাতি তাঁর সংগ্রহে রয়েছে কি না—এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া সময়সাপেক্ষ গবেষণার বিষয়। তবে সেলিমের সুগন্ধি ধানের সংগ্রাহকে নির্দ্বিধায় বিরল বলা যায়।’
হারানো কিংবা বিলুপ্ত প্রজাতি খুঁজতে সময়সাপেক্ষ গবেষণার বিষয় হলেও সেলিমের ধান সংগ্রহ দীর্ঘদিনের একটি মনোযোগী ও মহতী কর্মযজ্ঞ বলে মন্তব্য করেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব ও বীজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মো. আসাদ-উদ-দৌলা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরিবেশের বিরূপ প্রভাবের কারণে ধানের অনেক প্রজাতি বিলুপ্তপ্রায়। সেলিমের ৪১ জাতের ধানের সংগ্রহ থেকে ভালো বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে জিন প্রযুক্তির মাধ্যমে উন্নত জাতের ধান উদ্ভাবন করা সম্ভব। এক হাতে ৪১ জাতের ধান সংগ্রহ অবশ্যই সাধুবাদ জানানোর মতো একটি উদ্যোগ। আমি তাঁকে অভিনন্দন জানাই।’
kanakbarman 5:56 অপরাহ্ন on নভেম্বর 5, 2009 Permalink |
বিশ্বব্যাংক বা অন্যান্য দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ঋণ নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে হয়তো একজন মস্তবড় গবেষক কিংবা বিজ্ঞানী হওয়া যেতে পারে কিন্তু দেশের খুব বেশি উপকারে আসা যায় না।